Friday, August 10, 2018

সপ্তাহের তিনদিন মাইকিং করে বিদ্যূৎ বন্ধ ঘোষনা

মোঃ আমিরুল হক :
রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতির গ্রাহকরা গরমে অতিষ্ট গয়ে বলেন, “বিদ্যূৎ যায়না মাঝে মাঝে আসে” এই কথার ব্যাখ্যা টানতে গিয়ে অনেকেই বলেন, বিদ্যূৎ নাগরিক জীবনের চাহিদার একটি প্রথম অন্তরায়। বিদ্যূৎ ব্যতিত আজ এই ডিজিটাল বাংলাদেশে কোন কিছুই ভাববার উপায় নেই। কিন্তু রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতির আওতায় রাজবাড়ী, সদর, গোয়ালন্দ, কালুখালী, পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলার গ্রহকরা চরম অতিষ্টতার মধ্যে জীবন যাপন করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী সমস্যার মধ্যে রয়েছে বালিয়াকান্দি উপজেলার গ্রহকবৃন্দ। সম্প্রতি দু‘একদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতির কর্মকর্তা গ্রাহকদের আবোল তাবোল বুঝ দিলেও দুর্যোগ পরবর্তীতেও রয়েছে একই অবস্থা। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুসারে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপান্তর এর লক্ষে বিভিন্ন প্রকার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই ডিজিটাল বাংলাদেশে রুপকার এর সেই বক্তব্যকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হচ্ছে বিদ্যূৎ বিভাগ থেকে। সম্প্রতি এই কয়েকদিনে বালিয়াকান্দি উপজেলায় বিদ্যূৎ এর যে অবস্থা চলছে তা অতিমাত্রায় অসহনিয়। মাসের মধ্যে ৮দিন থেকে ১২ দিন মাইকিং করে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিদ্যূৎ বন্ধ থাকার পর আবার কখনো কখনো ২-৩ ঘন্টা পর ২০-২৫ মিনিট বিদ্যূৎ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পল্লী বিদ্যূতের বালিয়াকান্দি অভিযোগ কেন্দ্রের কর্পোরেট নাম্বার ০১৭৬৯-৪০১৭৬১ তে কল করা হলে তারা সেই ফোনটি বিজি করে রাখে। এমনকি কল হলেও ফোন রিসিভ করেননা। কথনো কখনো ফোন তুলে তারা উচ্চস্বরে গ্রাহকের সঙ্গে অকথ্য ভাষায় কথা বলেন।
সম্প্রতি অভিযোগ কেন্দ্রে কর্মরত মোঃ আনোয়ার হোসেন এর কাছে বিদ্যূৎ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে ফোন দিলে তিনি বলেন, আপনাদের বিদ্যূৎ দেওয়া অনেক দেরী আছে। তার নিকট জানতে চাওয়া হয় আপনার নিকট বেশ অনেক বার কল দেওয়া হয়েছে কিন্তু রিসিভ করেননি। এটা কেমন কথা। উত্তরে আনোয়ার হোসেন বলেন, আপনি একটা পশু, কেনো এতো বার কল করেছেন। আপনার নিকট কোন জবাবদিহিতা করতে আমি বাধ্য নই। সাংবাদিক পরিচয় দিলে আনোয়ার হোসেন আরো রাগান্নিত কণ্ঠে কলেন, আপনি যেই হন আমার কিছু আসে যায়না। আপনি একটা অশিক্ষিত বর্বর। পরক্ষনে রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজারের ০১৭৬৯-৪০০০৬৭ নাম্বারে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন নাই।
রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতি কর্তৃপক্ষ প্রতি শুক্রবারের আগে কোন প্রকার মাইকিং করে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার-শনিবার সারাদিন ৩৩ কেবি‘র রক্ষনা-বেক্ষনের কাজের অজুহাতে বিদ্যূৎ সংযোগ বন্ধ করে রাখে। কিন্তু পিডিবি‘র লাইন কোন প্রকার বন্ধ থাকে না। এদিকে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যূতের লোডশেডিং দিয়ে গ্রাহকদের নাজেহাল করছেন ইচ্ছা মতো। এটা যেন দেখার কেউ নেই। আগে প্রতি শুক্র ও শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এমন করে মাসে ১১২ ঘন্টা বিদ্যূৎ বন্ধ রাখে মাইকিংয়ের মাধ্যমে। সম্প্রতি দুইদিনের সঙ্গে বন্ধের তালিকায় আরো একদিন যোগ হয়েছে। আর কারনে অকারনে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ ঘন্টা বন্ধ রাখে ২৩২ থেকে ২২০ ঘন্টা। প্রতিমাসে বন্ধ রাখা হয় ৩৩২ থেকে ৩৪২ ঘন্টা। মাসে ৭২০ ঘন্টার মধ্যে রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতি বিভিন্ন অযুহাতে বন্ধ রাখে ৩৩২ থেকে ৩৪২ ঘন্টা। গ্রাহকরা বিদ্যূৎ সুবিধা পাচ্ছে গড়ে প্রতিমাসে ৩৭৮ থেকে ৩৮৮ ঘন্টা। এরপর দেখা যায় বিদ্যূতের ভৌতিক বিল। সরকারের কী এর কোন আইন আছে। নাকি শুধুমাত্র বিদ্যূৎ বিভাগের জন্য আইন করেছে। যদি ভোক্তাদের জন্য কোনো আইন থাকে তবে সেটা কেনো প্রয়োগ করা হয় না। পল্লী বিদ্যূতের ভোক্তা অধিকার আইন কখনোই গ্রাহকদের জানানো হয়না। শুধুমাত্র বিদ্যূৎ বিলের সঙ্গে বিদ্যূৎ বিভাগের আইনগুলোই দেওয়া হয়। যা দিয়ে সাধারন গ্রাহকদের নিগৃহিত করা যায়। পল্লী বিদ্যূৎ সতিমি একটি সায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এর মূল মালিক গ্রাহকগণ। কিন্তু সেই গ্রাহকদেরকেই অকথ্য ভাষা প্রয়োগ করে কর্মচারীরা। বিদ্যূৎ বিভাগ তাদের কোনো প্রকার বিচারের আওতায় আনেনা।
একটি বিষয় থেকে জানা যায়, দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যূৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রোপ্রধান জিয়াউর রহমান একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গঠন করেন বাংলাদেশ পল্লী বিধ্যূৎ বিদ্যূতায়ন বোর্ড (আরইবি)। সংস্থাটি সে সময় গড়া হয়েছিল মার্কিন বিদ্যূতায়ন সংস্থার আদলে। কথা ছিল এটি গ্রামপর্যায়ে বিদ্যূৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যূৎ সমিতিগুলো গড়ে তুলতে ও তাদের কার্যক্রমে সাহায্য করবে। সমিতিগুলো স্বাধীন হয়ে উঠলে একপর্যায়ে আরইবির আর কোনো প্রয়ৈাজন পড়বে না। যদিও পল্লী বিদ্যুতায়ন আইন ২০১৩ অনুযায়ী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। এর সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে আরইবির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এর বিপরীত। ক্রমশ আরইবি হয়ে উঠছে পবিসগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আরইবির একজন কর্মকর্তাও পবিসের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে দাপ্তরিকভাবে হয়রানি করতে পারেন। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন যে, মহান লক্ষ্য থেকে আরইবির গোড়াপত্তন হয়েছিল আজ তা ভেস্তে যেতে বসেছে। এর কারণ হিসাবে চেয়ারম্যানের ভূমিকা সিন্ডিকেটের অবৈধ বাণিজ্য, মাঠ পর্যায়ের দূর্ণীতি রোধে ব্যর্থতা এবং সরকারের যথার্থ তদারকির অভাবকেই দায়ী করছে সাধারন গ্রাহগণ। এসব ক্ষেত্রে দ্রুতই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া যায় তাহলে সেই দিন খুব দূরে নয় যখন আবারও কানসাটের মতো পরিস্থিতি কোনো না কোন গ্রামাঞ্চলে সৃষ্টি হবে। দায়টা তখন সরকারকেই বহন করতে হবে। তাই আরইবিকে কক্ষপথে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এখনই কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এটা সাধারন গ্রাহকদের দাবী। গোড়ার দিকে পরিকল্পনা ছিল পল্লী বিদ্যুতায়নের কাজটি সরাসরি করতে প্রত্যেক এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হবে এর সদস্যদের দ্বারা। বিদ্যুৎ সংযোগ নেয়া প্রত্যেক গ্রাহকই হবেন সমিতির সদস্য। তাদের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সেই প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চলবে সমিতি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই গ্রামে বিদ্যুতায়নের বিষয়ে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নিবেন। তবে সমিতি কর্তৃক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে আরইবি এসব সমিতিকে ঋণ দিবে। ঋণের ব্যবহার সর্বত্তোম হচ্ছে কিনা এবং তা ফিরে পাওয়ার নিমিত্তে সমিতির কর্মকান্ড তত্ত্বাবধায়ন করবে তারা। পরিকল্পনা ছিল এভাবে ঋণের ব্যবহার করে সমিতিগুলো স্বাধীন হয়ে উঠলেই এই বোর্ড ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আরইবির বিলুপ্ত হওয়া দুরের কথা তার অতি নিয়ন্ত্রক ভূমিকার কারণে পবিসগুলো কাজ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি আরইবি থেকে এমনসব হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে যে, পবিসগুলোতে নিজস্ব কোনো ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠতে পারছে না। সারাদেশের পবিসগুলোর কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, আরইবি তার সীমা ছাড়িয়ে একের পর এক কাজ করে চলছে যা বে-আইনি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পবিসগুলো চলার কথা না লাভ, না লোকসান নীতিতে। লাভ হলে বিদ্যুতের দাম কমিয়ে গ্রাহকদের সুবিধা দেয়ার কথা। কিন্তু আজ অবধি কোনো পবিসের বিদ্যুতের দাম কমেনি। বরং বাড়িয়েছে অনেকবার যা আজ গ্রাহকদের নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে। নিয়মে বলা আছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো হবে স্বায়ত্ত্বশাসিত। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিদ্যুতের গ্রাহকরাই হবেন এর সদস্য এবং তারা সকলে সমান অধিকার ভোগ করবেন। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরী কিংবা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তাদের সকলের মতামত গঠনতান্ত্রিক পন্থায় গৃহীত হবে। অর্থাৎ পবিসের প্রাণ হচ্ছেন গ্রাহকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত পরিচালকরা। পবিসের নিয়ন্ত্রণ এই পরিচালকদের হাতেই থাকার কথা। আরইবির কাজ হচ্ছে তাদের দেখভাল করা, হস্তক্ষেপ করা নয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আরইবি নিয়ন্ত্রণ জারি করছে। পবিসগুলোতে স্থাণীয় গ্রাহকদের ভোটে নির্বাচিত পরিচালকদের কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যে ভূমিকা নেই এটা নিশ্চিত করছে প্রতিদিনের জাতীয় পত্রিকাগুলোর অসংখ্য খবর। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তি, ঘুষ বা  চাঁদা প্রদানের বিনিময়ে সংযোগ নিতে হয়, এ তো নিত্যদিনের অভিযোগ। এটা ঘটছে কারণ পবিসের সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে আরইবি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। যদিও বিধি মোতাবেক গ্রাহক সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ কর্তৃক গঠিত সমিতি পরিচালনা বোর্ড সমিতির মালিক। বিধি মেনেই ওই সমিতির কার্যক্রম চালাতে শ‘ শ‘ কোটি ঋণ গ্রহন করে। এ ঋণ যে নগদে আসে তা নয় বরং আরইবি কর্তৃক নির্মিত লাইন ও উপকেন্দ্র বুঝে নেয়ার সময় তার মূল্য নিরূপর করে তা ঋণ হিসাবে ধরা হয়। সমিতি পরিচালনা বোর্ডের নামে ঋণ এলেও কীভাবে এসব মালামাল ব্যবহার হচ্ছে বা হবে সেক্ষেত্রে সমিতি পরিচালনা বোর্ডের কোনো বক্তব্য বা করণীয় থাকে না। গ্রাহক প্রতিনিধিরা ব্যবহৃত হয় রাবার স্ট্যাম্পের মতো। আর সমিতির ভূমিকা হয় স্বাক্ষীগোপনের নিয়ম অনুযায়ী আরইবির নিয়ন্ত্রণাধীন ২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৭৮ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মালিক। ইতিপূর্বে পল্লী বিদূতের অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে কানসাটে একটি জন বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে মিটার ভাড়া বাদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে তৎকালীন সরকার। অথচ রাজবাড়ী পল্লী বিদ্যূৎ সমিতি সেটাকে কোন ভাবেই গ্রাহ্য করেন না। বাংলাদেশ সরকারের আইনের মধ্যে পরে ভোক্তাদের সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া। কোন প্রতিষ্ঠান তার কোন পণ্য বাজারে বাজারজাত করতে হলে সেটাকে বিএসটিআই পরীক্ষা করা। সেটার সনদ গ্রহন করে লোগো বসানো। কিন্তু পল্লী বিদ্যূদের মিটারগুলোতে কোন বিএসটিআই নেই। মিটারগুলো বিদ্যূৎ অফিসে এনে সেটাকে তাদের নিজেদের লোকের মাধ্যমে কারসাজি করে গ্রাহকের প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়। পিডিবি‘র মিটারে এক ইউনিট বিদ্যূৎ পুরে যে কাজ হয় পিবিএস‘র মিটারে সেই কাজ করতে ২ থেকে ৩ ইউনিট বিদ্যূৎ পুরানোর খরচ দেখা যায়। পিবিএস‘র মিটারগুলোকে গ্রাহক ঠকানোর জন্য তাদের নিজেদের অফিসের লোক দিয়ে কারসাজি করা হয় বলে অনেকেই অভিযোগ করেন। যেমন পিডিবি‘র লাইন স্থাপন করতে যে কোন মিটার হলেই চলে তবে সেটা অবশ্যই বিএসটিআই এর অনুমোদন থাকতে হবে। তবে পিবিএস‘র লাইন স্থাপন করতে তাদের মিটার ছাড়া লাইন পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মিটারগুলোতে কোন প্রকার বিএসটিআই‘র অনুমোদন নেই। স্বাধীন এই দেশে সাধারন মানুষ আর কত প্রতারনার শিকার হবে সেটা জানা নেই। তবে সরকারের উচিৎ এদিকে নজর দেওয়া।