আপনার আশে পাশের বিভিন্ন ঘটনা-দূর্ঘটনা, প্রকৃতি পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠান এর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন- [email protected]

আজ বিশ্ব এইডস দিবস চরম ঝুঁকিতে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর হাজার হাজার বাসিন্দা


আসজাদ হোসেন আজু, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
আজ ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস। দিনটিতে এইডস নিয়ে সচেতন ধর্মী বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে বিশ্ব জুুড়ে। বাংলাদেশেও এরুপ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বেশিরভাগ কর্মসূচিই সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক হলেও এইডস ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠির এইডস নির্ণয়ে নেই নিয়মিত বিশেষ কোন কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের সর্র্ববৃহত দৌলতদিয়া যৌনপল্লী রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলাতে অবস্থিত। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এইডস পরিস্থিতি অনেকটা ভাল থাকলেও যৌনপল্লী থাকার কারণে দেশের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো এইডস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদের মধ্যে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর প্রায় ৫হাজার বাসিন্দা সরাসরি চরম এইডস ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদের মধ্যে কারও শরীরে এই মরণ ব্যাধির ভাইরাস আছে কিনা তাও বোঝার উপায় নেই। কেন না এইডস নির্ণয়ের জন্য এখানে নিয়মিত সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোন কার্যক্রম নেই। তবে চলতি বছর জুন মাসে ঢাকা থেকে আইসিডিডিআরবি’র একটি দল এ পল্লীর ৭৪৫ জন যৌনকর্মীর রক্তের নমূনা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে ২৫ জনের রক্তে বিভিন্ন যৌন রোগের নমূনা পাওয়ায় তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। এছাড়া কারো রক্তে এইচআইভিএইডস এর ভাইরাস আছে কিনা তা প্রকাশ করেনি সংস্থাটি।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সাথে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয় দৌলতদিয়া ঘাট। সড়ক, রেল ও নৌপথে এখান দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে ও অনেকেই অবস্থান করে থাকে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ ছাড়াও এইডস এর আধিখ্য ভারত ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদেরও এখানে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এদের অনেককেই যৌনকর্মিদের কাছে যাতায়াত করতে দেখা যায়। পাশাপাশি এইডস আক্রান্ত হওয়ার মতো সবগুলো ঝুঁকিই এখানে বিদ্যমান রয়েছে। অবাধ যৌনকর্ম, একই সুঁই ও সিরিঞ্জের মাধ্যমে অনেকে নেশা গ্রহণ এখানে নিত্য-নৈমত্তিক বিষয়। এতে করে পল্লীর যৌনকর্মি, তাদের সন্তান, খরিদ্দার প্রত্যেকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি বাইরে থেকে আসা খরিদ্দারদের মাধ্যমে এ রোগ তাদের পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। এনজিও পিএসটিসি ও পায়াক্ট বাংলাদেশের মাধ্যমে পল্লীর যৌনজীবিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিক্ষা, যৌন রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদানসহ বিনামূল্যে কনডম বিতরণ কার্যক্রম দীর্ঘদিন চললেও বর্তমানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় হাসপাতালেও চিকিৎসক ও দক্ষ কর্মি কম থাকায় এবং যৌনজীবিদের হাসপাতালে এসে পরীক্ষা-নিরিক্ষায় অনিহা থাকার কারণে তারা বর্তমানে একে বারেই এ বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছে। মারাত্মক যৌন রোগ বা সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় হাতুরে ডাক্তার ও ক্লিনিকে যায়। সেখানে তাদের থেকে গলাকাটা ফি আদায় করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল চিকিৎসায় অবস্থা আরো জটিল হয়।
সরেজমিন জানা গেছে, দৌলতদিয়ার এ যৌনপল্লীতে তালিকাভূক্ত যৌনকর্মির সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। এর বাইরে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরী ও ছুকরির (বাড়ীওয়ালা-বাড়ীওয়ালীদের নিকট জিম্মি) সংখ্যা আরো অন্তত ৫ শতাধিক। অল্প বয়স্ক এ সকল যৌনকর্মিদের যৌনকর্মের ব্যাপারে কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই। তাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা খদ্দেরদের কাছ থেকে বেশী টাকা নিয়ে এ সকল কিশোরীদের কনডম ছাড়া যৌনকাজ করতে বাধ্য করে। এ ছাড়া পল্লীর সাধারণ প্রায় সকল যৌনকর্মীর একজন করে কথিত স্বামী (বাবু) রয়েছে। এদের সাথে যৌনকর্মীরা নিয়মিত অনিরাপদ মিলামিশা করে। পাশাপাশি পল্লীর অনেক যৌনকর্মী সম্প্রতি বিভিন্ন ধরণের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। নেশার টাকা যোগাতে অনেকে বহু দায়-দেনা হয়েছে। এ অবস্থায় দেনা পরিশোধ ও নেশার টাকা যোগাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও বেশি টাকার জন্য খদ্দেরদের সাথে অনিরাপদ যৌনকাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন যৌনকর্মী জানান, তারা এখানে প্রবেশের সময় বাড়ীওয়ালাদের নিকট নানাভাবে মোটা অঙ্কের টাকা দেনা হয়ে যান। দেনা পরিশোধসহ নিয়মিত প্রভাবশালীদের চাঁদা দেয়া এবং বেঁচে থাকার ব্যায়বহুল খরচ যোগাতে তাদের অনেকেই অনিরাপদ যৌনকাজ করে। এছাড়া এখানে পাচার হয়ে আসা অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোরীদের এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন স্বাধীনতা নেই। তাছাড়া অনেক মেয়ে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন দামী নেশা দ্রব্যের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। টাকা যোগাতে তারা নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ যৌনকাজ করছে।
এ বিষয়ে বেসরকারি সংগঠন ভিপিকেএ পরিচালিত সূর্যের হাসি ক্লিনিকের গোয়ালন্দ শাখার ব্যবস্থাপক অসিম কুমার ভদ্র জানান, সপ্তাহের প্রতি শনিবার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর পাশে পুড়াভিটায় তারা ক্যাম্প পরিচালনা করেন। সেখানে তাদের প্যারামেডিক ডাক্তার থাকেন। ক্যাম্পে আসা পল্লীর মহিলাদের এইচআইভি এইডস সহ বিভিন্ন যৌন রোগের ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া ন্যূনতম মূল্যে কনডম বিতরণ করা হয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে পল্লীর যৌনজীবিদের অনেকেই কনডম ব্যবহার করে না। ফলে যৌনজীবিরা ছাড়াও তাদের কাছে আসা খরিদ্দাররা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
যৌনজীবিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতির নির্বাহী পরিচালক মর্জিনা বেগম ও কর্মকতা আতাউর রহমান মঞ্জু জানান, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর বাসিন্দারা মারাত্মক এইডস ও অন্যান্য যৌনরোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা থাকলে তারা অপেক্ষাকৃত ভাল থাকতো। কিন্তু এ সুযোগ এখানে একেবারেই সীমিত। এ বছর জুন মাসে আইসিডিডিআরবি পল্লীর ৭৪৫ জন মেয়ের রক্তের নমূনা সংগ্রহ করেছে। এদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ২৫ জনের বিভিন্ন যৌন রোগের সমস্যা থাকায় তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছে। সবাইকে এই সেবার আওতায় নিয়ে আসা দরকার বলে তারা মনে করেন।

No comments: