আপনার আশে পাশের বিভিন্ন ঘটনা-দূর্ঘটনা, প্রকৃতি পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠান এর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন- [email protected]

কুড়িগ্রামে পারিবারিক কলহে তিন মাসে ২৩৯ মামলা প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে পরিবারের লোকজনই



বাদশাহ্ সৈকত, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : ০২.১১.১৮
কুড়িগ্রামে জমি-জমা সংক্রান্ত পারিবারিক কলহের জের দিনে দিনে হিংসা থেকে প্রতিহিংসায় রুপ নিচ্ছে। আর এ প্রতিহিংসার হাত থেকে রেহাই মিলছে না মায়ের পেটের আপন ভাইয়েরও। মাঝে মধ্যসত্ব ভোগী হয়ে ফায়দা লুটছে পুলিশ। ভালো মন্দ বিবেচনা না করেই বৃদ্ধদেরও গ্রেফতার করে দাবী করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। টাকা না দিলে নিরীহ মানুষকে খাটতে হচ্ছে হাজত বাস। শুধু তাই নয় নিরপরাধ ব্যাক্তিদের নামে আদালতে চাওয়া হচ্ছে রিমান্ডও।
জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, এরকম জমিজমা ও পারিবারিক তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত তিন মাসে জেলার ৯ থানায় মামলা দায়ের হয়েছে ২শ ৩৯টি। এসব মামলার অধিকাংশই হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য।

পারিবারিক কলহের জের ধরে এমনিই একটি ঘটনা ঘটেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার উত্তর দলদলিয়া গ্রামে। আপন ভাইয়ের মোটর সাইকেল চুরির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে ৬৫ বছর বয়সের আব্দুল ওয়াদুদ নামের এক বৃদ্ধ বড় ভাইকে। আপন ভাইয়ের করা মোটর সাইকেল চুরির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে থানায় মোটর সাইকেলের দাম ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা দাবি করেছে পুলিশ। কিন্তু সে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মোটর সাইকেল চুরির অপরাধে কোর্টে চালান করা হয়। এমনকি এই মামলার আইও বিচারকের নিকট বৃদ্ধের নামে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে বসে। কিন্তু বিচারক বৃদ্ধকে হয়রানীর বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে জামিন দেন। আর জামিন নিয়ে আসার পরও পুলিশ তার নিকট দাবী করেই চলেছে হারানো মোটরসাইকেলের মূল্য হিসেবে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে ছোট ভাইয়ের মোটর সাইকেল চুরির মামলায় অভিযুক্ত মো: আব্দুল ওয়াদুদ এর সাথে কথা হয় তার বাড়িতে। এসময় তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে চোখের পানি ফেলে এ প্রতিবেদককে বলতে শুরু করেন, আমার আপন ছোট দুই ভাই যাদের আমি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি তারাই আমার নামে মোটর সাইকেল চুরির মামলা দিয়ে পুলিশি হয়রানী করছে। এমনকি পুলিশ দিয়ে অন্যায় ভাবে আমাকে বাড়ি থেকে টেনে হিছড়ে তুলে নিয়ে থানা হাজতে রেখে আমার নিকট মোটর সাইকেলের দাম ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা দাবী করা হয়। কিন্তু আমি বার বার মোটর সাইকেল চুরি করিনি বলা সত্বেও আমার উপর টাকার ্জন্য একাধিকবার চাপ প্রেয়োগ করে টাকা না পাওয়ায় জেল হাজতে পাঠানো হয়। পরে সেখানে দুই দিন হাজত বাসের পর আদালতে তুললে সেখানেও উলিপুর থানার এইআই সাইফুল ইসলাম বিচারকের নিকট আমার সাত দিনের রিমান্ড দাবী করে। কিন্তু বিচারক আমাকে জামিন দেয়।
তিনি আরো জানান, আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাড়িতে আসার পরও ঐ এইআই সাইফুল ইসলাম আমার নিকট মোটর সাইকেলের দাম ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা দাবী করতে থাকে। টাকা না দিলে আমাকে বিভিন্ন মামলায় ফাঁসাবেন বলে হুমকী দিতে থাকে। আমার তিন সন্তান এখন উচ্চ শিক্ষিত তারা বাইরে চাকরী করে। এ অবস্থায় এই বয়সে আমি আমার স্ত্রীসহ এই পুলিশ ও আমার আপন দুই ছোট ভাই মো: আব্দুল ছালাম ও আব্দুল মাজেদ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অত্যাচারে বাড়িতে ঠিক মতো ঘুমাতে পারছি না। আমি এই বৃদ্ধ বয়সে সামাজিক ভাবে খুবই হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। আমি আমার ছোট ভাই ও উলিপুর থানার এইআই সাইফুল ইসলামের হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং সুষ্ঠ বিচার পাওয়ার জন্য পুলিশের উর্ধতন কতৃপক্ষসহ জেলা প্রশাসককে লিখিত অভিযোগ করেছি। কেন না এরা শুধু আমাকে নয় আমার ছেলের শশুরসহ আমার তিন ছেলে ও ছেলের বউদের নামেও মামলা দিয়েছে।
কেন হয়রানী করছে এটা জানতে চাইলে আব্দুল ওয়াদুদ জানান, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমার ভাইরা আমার নামে কয়েকেটি মামলা দেয়। কিন্তু সেই মামলায় তারা হেরে যাওয়ায় আমাকে মোটরসাইকেল চুরির মামলা দেয়াসহ বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করছে।

এসময় আব্দুল ওয়াদুদের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার স্বামী বৃদ্ধ মানুষ সে মোটর সাইকেল চালাতে পারে না। তারপরও আমার স্বামীর নামে মোটর সাইকেল চুরির মামলা দিয়ে তাকে টেনে হিছড়ে ধরে নিয়ে মোটর সাইকেলের দাম হিসাবে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা দাবী করে পুলিশ। তা দিতে না পারায় তাকে জেল হাজতে পাঠায়। আমার তিন ছেলে তাদের বউসহ বাইরে চাকরী করে। আমরা বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী থাকি। কিন্তু আমার স্বামীর ছোট ভাই তাদের সন্তানরা ইট-পাটকেল দিয়ে বাড়িতে ঢেলাঢেলি করে। তার উপর পুলিশের অত্যাচারে আর বাড়িতে থাকতে পারছি না।

আব্দুল ওয়াদুদের বাড়ি সংলগ্ন বুড়ির ভিটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: নুরনবী জানান, আব্দুল ওয়াদুদ এই এলাকার একজন সৎ ও সজ্জন ব্যাক্তি। ওনার তিন সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। দুই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার এবং চাকুরীজীবি। আর এক ছেলে বৃত্তি নিয়ে জাপানে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আপনাদের কাছে প্রশ্ন তাদের পিতা কি চোর হতে পারে।

প্রতিবেশি হাফিজুর রহমান জানান, একজন ৬৫ বছরের বৃদ্ধের নামে মোটর সাইকেল চুরির মামলা দেয়া হয়েছে যেখানে তিনি মোটর সাইকেল চালাতেই পারেন না। তার ছোট ভাইয়েরা তাকে পুলিশ দিয়ে হয়রানী করছে। এমনকি তাকে জেলা হাজতেও রাখা হয়েছিল এবং রিমান্ডও চাওয়া হয়েছিল। তবে বিচারক বিষয়টি বুঝতে পেরে তার রিমান্ড মঞ্জুর না করে জামিন দিয়েছেন। তাকে হয়রানীর বিষয়টি খুবই দু:খ জনক।

এব্যাপারে চুরি যাওয়া মোটর সাইকেলের মালিক আব্দুল ওয়াদুদ এর ছোট ভাই আব্দুল মাজেদ এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার মোটর সাইকেলের কোন লাইসেন্স ছিল না। তাই ইঞ্জিন ও চেচিস নাম্বার দিয়ে উলিপুর থানায় কারো নাম উল্লেখ না করেই অভিযোগ দিয়েছি। পরে বুঝতে পারলাম আমার বড় ভাইয়ের সাথে বনিবনা না থাকায় সে এই মোটর সাইকেল চুরির সাথে জড়িত থাকতে পারে। এজন্য সন্দেহবশত আব্দুল ওয়াদুদের নাম দিয়েছি। 

এব্যাপারে উলিপুর থানার এসআই সাইফুল ইসলাম এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমি কারো কাছে টাকা-পয়সা দাবী করিনি। আমি মামলাটি তদন্ত করছি। আমি প্রথম আব্দুল ওয়াদুদের নিকট এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি আমাকে জানান, মোটর সাইকেল চুরি হয়নি। মোটর সাইকেলের মালিক মোটর সাইকেল বিক্রি অথবা সরিয়ে ফেলে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। এজন্যই আব্দুল ওয়াদুদকে সন্দেহ মূলকভাবে গ্রেফতার করে আইন মেনে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

উলিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো: মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, এই মামলার তদন্ত অফিসার সাইফুল ইসলাম একাধিকবার আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও বাদীর ভাষ্যমতে আমাকে জানায় যে আব্দুল ওয়াদুদ এ মোটর সাইকেল চুরির মূল হোতা। এ কারনে তাকে গ্রেফতার করে জেলা হাজতে পাঠানো হয়। জামিনে আসার পর তার নিকট পুলিশ টাকা চাচ্ছে, হুমকী-ধামকী দিচ্ছে এটা আমার জানা নেই। কেউ আমাকে অভিযোগও করেনি।

অভিযোগে জানা গেছে গত ০৯/০৮/১৮ ইং তারিখ রাতে উত্তর দলদলিয়া গ্রামে আব্দুল মাজেদ এর ঘরের গ্রীল কেটে ১৫০ সিসি লাল রংয়ের একটি পালসার গাড়ি চুরি হয়। পরে ১১/০৮/১৮ ইং তারিখে মাজেদ বাদী উলিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলা নং-জিআর-৩২৭/১৮। এই মামলায় ০৬/১০/১৮ ইং তারিখে বাদীর আপন বড় ভাই আব্দুল ওয়াদুদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ০৯/১০/১৮ ইং তারিখ আব্দুল ওয়াদুদকে আদালতে তুলে রিমান্ড চাওয়া হলে আদালতের বিচারক রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে জামিন দেন।

No comments: