আপনার আশে পাশের বিভিন্ন ঘটনা-দূর্ঘটনা, প্রকৃতি পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠান এর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন- [email protected]

এবার ‘গায়েবি ধর্ষণ’ মামলায় হয়রানি

এবার ‘গায়েবি ধর্ষণ’ মামলায় হয়রানিমামলার বাদী বলছেন, ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তিনি ধর্ষণের শিকার হননি। তাই ডাক্তারি পরীক্ষায়ও সম্মত হননি তিনি। এই নারী আদালতে লিখিতভাবেও এ কথা জানিয়েছেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা পুলিশ বলছে, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাটি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরে। এই ‘গায়েবি ধর্ষণ মামলা’র আসামি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ। গ্রেপ্তার এড়াতে প্রায় এক মাস এলাকাছাড়া ছিলেন তিনি। সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে গত সোমবার সুনামগঞ্জের আদালতে হাজির হলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
হারুনুর রশিদ আদালতে হাজির হলে তাঁর আইনজীবী মামুনুর রশিদ জামিন প্রার্থনা করেন। আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, যেখানে বাদী বলছেন তিনি ধর্ষণের শিকার হননি, সেখানে ধর্ষণ মামলা সচল থাকতে পারে না।
পুলিশ বলছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্বম্ভরপুর থানায় হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন উপজেলার ২৬ বছর বয়সী এক নারী। মামলার এজাহারে বলা হয়, হারুনুর রশিদ তাঁকে একটি সেলাই মেশিন দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এ জন্য তিনি ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যান। তখন চেয়ারম্যান তাঁকে কার্যালয়ের দোতলার একটি কক্ষে যেতে বলেন। পরে তিনি ওই কক্ষে গেলে চেয়ারম্যান তাঁকে ধর্ষণ করেন।
এদিকে কথিত এ ঘটনার পরদিন ওই নারীকে পুলিশ ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে রাজি হননি।
এর সপ্তাহখানেক পর (৩ অক্টোবর) বিশ্বম্ভরপুর বিচারিক হাকিম আদালতে লিখিত আবেদন করেন ওই নারী। তিনি আদালতকে জানান, তিনি ধর্ষণের শিকার হননি। এ রকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আদালতে দাখিল করা আবেদনে তিনি বলেন, ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে এলাকার হাছান বশির নামের এক ব্যক্তি তাঁকে বাড়ি থেকে খবর দিয়ে নিয়ে যান। একটি সেলাই মেশিন উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পাইয়ে দিতে দরখাস্তে সই নেন। এরপর তাঁকে থানায় নিয়ে যান। এরপরই তাঁকে পুলিশ ‘ধর্ষিত’ হয়েছেন জানিয়ে পুলিশের জিম্মায় রাখে। পরদিন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। পরীক্ষা করাতে সম্মত না হওয়ায় তাঁকে বাড়ি ফিরে যেতে দেওয়া হয়।
গত সোমবার ওই নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আদালতে লিখিত আবেদনই তাঁর বক্তব্য বলে প্রথম আলোকে জানান। ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি তিনি শুরু থেকে অস্বীকার করে আসছেন বলে জানিয়েছেন। তাহলে মামলা, এজাহার দাখিল হলো কীভাবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমারে সেলাই মেশিন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সই নেওয়া হইছিল।’ কে সই নিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি হাছান বশিরের নাম বলেন।
ধর্ষণের অভিযোগে যে মামলাটি হয়েছে, তাতে চার সাক্ষীর নাম রয়েছে। প্রথম নামটি হাছান বশিরের। গতকাল মঙ্গলবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে হাছান বশির বলেন, ধর্ষণের ঘটনা সত্য। আবার আদালতে দাখিল করা ওই নারীর বক্তব্যও সত্য। দুটোই কীভাবে সত্য হয়? এমন প্রশ্নে হাছান বলেন, ‘বিষয়টি রাজনৈতিক হয়ে গেছে। আমি ওই দিন থানায় গিয়ে তাঁর কথা শুনেছি। পরে আবার অস্বীকার করতেও শুনেছি।’
বিশ্বম্ভরপুর থানায় যোগাযোগ করে জানা গেছে, মামলার তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারব না।’ ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করা ও ডাক্তারি পরীক্ষা না করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তাঁর বিষয়। আমরা মামলার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছি।’
হারুনুর রশিদ জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি বিশ্বম্ভরপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে আছেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি অবৈতনিক শিক্ষকতা করছেন। ১৯৯৭ ধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের শুরু। দুই মেয়াদে ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার পর ২০১৪ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল থেকে বিএনপি রাজনীতিতে সক্রিয় তিনি।
মামলার পর পুলিশের ধরপাকড় এড়াতে এলাকাছাড়া হয়ে সিলেটে অবস্থান করছিলেন হারুনুর রশিদ। সিলেটে অবস্থানকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশজুড়ে পুলিশ বাদী হয়ে হয়রানিমূলক যেসব গায়েবি মামলা করছে, এটি তারই অংশ।
বিশ্বম্ভরপুর সদরসহ তাঁর নিজ এলাকা ধনপুর ইউনিয়নে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন, এমন লোকজনও বলছেন, ঘটনাটি সাজানো। তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করতেই এ রকম ঘটনা সাজানো হয়েছে। হারুনুর রশিদের ঘনিষ্ঠ তিন বিএনপি নেতা বলেন, আগামী নির্বাচনে তাঁর দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছিলেন অনেকে। এ নিয়ে প্রচারণাও শুরু হয়েছিল। এ মুহূর্তে এ ধরনের মামলা হওয়ায় পুরো ঘটনাটি রাজনৈতিক বলে দেখছেন এলাকাবাসী।
তদন্ত চলছে বলে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান।
Source: prothomalo.com

No comments: