আপনার আশে পাশের বিভিন্ন ঘটনা-দূর্ঘটনা, প্রকৃতি পরিবেশ ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠান এর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন- [email protected]

শিশু বান্ধব শিক্ষা নিয়ে শিক্ষক শহিদুলের যত ভাবনা


মেহেদী হাসান মাসুদ :
পাকা সড়ক, পাশেই একটি বিদ্যালয়, চার পাশ সীমানা প্রাচীর, একটি গেট, গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই হাতের বাম পাশেই রয়েছে অভিভাবকদের বসার ব্যবস্থা, ২টি পাকা ভবন, বিদ্যালয়ের দক্ষিন পাশে একটি শহীদ মিনার। রয়েছে শিশুদের জন্য রিডিং কর্ণার, রাজু পার্কে থাকছে দোলনা থেকে শুরু করে শিক্ষনীয় খেলার যত সব আয়োজন। পুরো বিদ্যালয়টির ভবনে শিশুদের শিক্ষনীয় বিভিন্ন লেখা, বর্ণ, শব্দ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত চিত্র।

আসলেও এটি কোন বিদ্যালয় নয়, একজন প্রধান শিক্ষকের স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যার বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছেন কাগজ আঠা দিয়ে তৈরী করা তার কারুকাজের মাধ্যমে। যেটি প্রধান শিক্ষকের টেবিলের উপর রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে তিনি শিশুদের আনন্দদায়ক শিক্ষার উদ্দেশ্যে নিজ হাতে তৈরী করেছেন জাতীয় সংসদ ভবন, শহীদ মিনার, মুজিবনগর স্মৃতিসৌদ্ধ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মসজিদ, মন্দিরসহ বইয়ের পাঠ্যবই সংশ্লিষ্ট নানাবিধ ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে দৃষ্টিনন্দন উপকরণ। যা একজন শিশু সামান্য সময়ে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে। 

ওই শিক্ষকের নাম মো: শহিদুল ইসলাম, তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার স্বাবলম্বী ইসলামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষক মো: শহিদুল ইসলাম উপজেলায় সততার কারিগর হিসেবে পরিচিতি। বর্তমানে তার বিদ্যালয়টি রাজবাড়ী জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবেও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন, বিদ্যালয়ের শিশু বান্ধব শিক্ষার পরিবেশ, তার তৈরী সততা ষ্টোরসহ বিদ্যালয়ের বেশ কিছু ব্যতিক্রমী কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষকদের মাঝে বেশ পরিচিতি পেয়েছে।

শিক্ষক মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, কাগজ ও আঠা দিয়ে তৈরী করেছি কেমন হওয়া উচিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কেমন হতে পারে তার আঙিনা, বা কেমনই হতে বিদ্যালয় ভবন, শ্রেণিকক্ষ। আমরা শিশুদেরকে স্কুল মুখী করতে বাড়ীতে বাড়ীতে হোম ভিজিট, ঝরে পড়া রোধে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে থাকি। আসলে বিষয়টি এমন হওয়া উচিত নয়, শিশুরা এমনিতেই নিজ উদ্যোগে স্কুলে আসবে, বাড়ীর থেকে শ্রেণিকক্ষে থাকতেই তারা বেশী মনোযোগী হবে। তেমনি ভাবেই আমার বিদ্যালয়টি ক্রমে ক্রমে সাজাচ্ছি বলে যোগ করেন তিনি। এক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের ভূমিকা প্রশংসনীয় এবং শিশু শিক্ষা বান্ধব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

প্রধান শিক্ষক মো: শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশুদের শিক্ষার মাধ্যম যদি আনন্দদায়ক না হয় তাহলে সেটা প্রকৃত শিশু শিক্ষা নয়। কিন্তু আমরা সেটা ভুলেই গেছি। সারা দিন ক্লাস, সন্ধ্যার পর কোচিং, রাতে আবার প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া মুখস্থ করা ইত্যাদি করেই শেষ হয় একজন শিক্ষার্থীর নিত্য দিনের কাজ। অথচ খেলাধুলা, বিনোদন করা লেখাপড়ার যে একটা অংশ সেটি ভুলতে বসেছি আমরা। পড়ায় সারা দিন ডুবে থাকতে হচ্ছে ওদের। যা মানসিক শক্তি বিকাশে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে কোমলমতি শিশুদের। অথছ আনন্দদায়ক পাঠদান, খেলার ছলে শিশুদের শিক্ষাদান শিক্ষক হিসেবে আমাদেরই দায়িত্ব।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের অভিভাবক কোচিং বা প্রাইভেটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে অনেকটাই। এর জন্য মূলত আমরা শিক্ষকরাই দায়ী। অর্থের লোভে সহজ বিষয়টাকে শিশুদেরকে কঠিন করে উপস্থাপন করা। যার ফলে অপরাগ হয়ে পরে তার কাছে প্রাইভেট বা কোচিং করতে বাধ্য হচ্ছে। যা শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয় বরং মানুষ হিসেবে বিবেক বর্জিত কাজ এটি, শিশুদের সাথে প্রতারণা। তাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখনই শিশুদের খেলার ছলে, আনন্দ দায়ক পরিবেশে শিক্ষাদান করানোর কথাও বলেন তিনি।

আমাদের বিদ্যালয়টি আমাদের চাওয়ার মতই, ঠিক যেমনটি আমরা চাই, তাছাড়া আমাদের বাড়ী থেকে বিদ্যালয়টিতে থাকতে বেশী ভাল লাগে বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির শিক্ষার্থী নাবিদুজ্জামান অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাসুম রেজা বলেন, প্রধান শিক্ষক মো: শহিদুল ইসলাম আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গতানুগতিক ধারাকে নতুনত্বের আর্বিভাব ঘটিয়ে এবং শিক্ষা বান্ধব একটা পরিবেশ তৈরী করেছে বিদ্যালয়টিতে। একই সাথে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ম্যানেজিং কমিটির সমন্বয়ে সকলের অংশিদারিত্বে কিভাবে বিদ্যালয়টি শিশু বান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যায় সেটি প্রধান শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন। তার স্কুলে সততা স্টোর থেকে শুরু করে সুশৃংখল মানসম্মত শিক্ষার যে পরিবেশ তিনি তৈরী করেছেন সেটি উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে কাগজ ও আঠা দিয়ে তার হাতের দৃষ্টিনন্দন উপকরণ শিশুদেরকে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপনা সম্পর্কে খুব সহজেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমি মনে করি বিদ্যালয়টি শুধুমাত্র বালিয়াকান্দি বা রাজবাড়ী জেলায় নয় সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে একটি মডেল।

No comments: